মঙ্গলবার, ২৩ Jun ২০২৬, ০৬:৩৭ অপরাহ্ন
ষাট ও সত্তর দশকের অভিনয় শিল্পীদের একে একে প্রস্থানের পর থেকে দেশে গুণী অভিনয় শিল্পী এখন বলতে গেলে নেই-ই। সেটা চলচ্চিত্রে যেমন পাশাপাশি ছোটপর্দা, মঞ্চ- সব খানেই। এ নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছিল শোবিজে। অন্যদিকে সিনিয়র শিল্পীদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা এখনো তাদের অভিনয়ের সেরাটা দেওয়ার মতো সক্ষমতা রাখেন। কিন্তু তাদের অনেকেই অভিনয়ে নেই। পত্রিকার তরফে যখন তাদের কুশলাদি জানতে গিয়ে অভিনয়ে না থাকার কারণ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয় তখন তারা সবাই একই বাক্যে বলেন, ‘কোন চরিত্রে অভিনয় করব। আমরা তো এমন গ্রেডের শিল্পী না যে কোনো একটা নাম কাওয়াস্তে চরিত্রে অভিনয় করব। তাই নিজের সম্মানহানি হয় এমন চরিত্রে অভিনয় করতে চাই না।’
সিনিয়র শিল্পীদের এই অভিমানের ভাষাটা কিন্তু অমূলকও নয়। সেটাই সম্প্রতি নামজাদা অভিনেতা মাহফুজ আহমেদ আরও বেশি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন যে, বুড়ো হাড়েও জাদু দেখাতে জানে। দীর্ঘ আট বছর পর যখন ফের বড়পর্দায় উপস্থিত হলেন চয়নিকা চৌধুরীর ‘প্রহেলিকা’ সিনেমায় তখন দর্শক যেন ঠিক আগের মাহফুজ আহমেদকেই স্বমহিমায় দেখতে পেলেন। এর আগে নাটক কিংবা সিনেমায় এই নামজাদা অভিনেতা মাহফুজ আহমেদের বহুমাত্রিক রূপ কতবার যে দেখেছে দর্শক তার কোনো হিসেব নেই। শেষ চমকটা দিয়েছেন গত ঈদে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমাটির মাধ্যমে।
সেই সময় মাহফুজ আহমেদের সঙ্গে যখন যায়যায়দিনের পক্ষ থেকে কথা বলা হয় তখন তিনি বলেছিলেন আরও একটি চমক আছে সামনে। কী সেই চমক, নতুন কোনো সিনেমা? বললেন, না, সিনেমা নয়- ওয়েব সিরিজ। কি সেই ওয়েব সিরিজের নাম? বললেন, এটাও তো এখন বলা যাবে না! এভাবেই নতুন নতুন চমক মাহফুজ আহমেদ একসময় নিয়মিতই দিয়ে আসছিলেন যখন নিয়মিত নাটক, টেলিফিল্ম, সিনেমায় অভিনয় করতেন।
এমনিতেই দীর্ঘ আট বছর অভিনয়ের বাইরে ছিলেন। ততোদিনে নতুন আরেকটি প্ল্যাটফর্ম দাঁড়িয়ে গেছে ওটিটি। ওটিটিতে এর আগে কখনোই নিজের চমক দেখাতে পারেননি মাহফুজ আহমেদ। তাই ‘প্রহেলিকা’য় চমক শেষ হতে না হতেই যুক্ত হয়ে গেলেন ওটিটির সঙ্গে। দর্শকের সবাই অপেক্ষায় ছিলেন নতুন প্ল্যাটফর্ম ওটিটিতে কেমন পারফর্ম করেন মাহফুজ আহমেদ সেটা দেখার।
এবার সময় এলো নতুন অধ্যায়ের মাধ্যমে নিজেকে জানান দেওয়ার পালা। তারই এক ঝলক কিংবা এক মিনিট দেখা গেল ওয়েব সিরিজ ‘অদৃশ্য’র ট্রেইলারে। সত্যিই তাই, এই প্রথম হাজির হতে যাচ্ছেন জাঁদরেল অভিনেতা মাহফুজ আহমেদ ওটিটি প্ল্যাটফর্মে আনিস আহমেদ চরিত্রে। সঙ্গে আছেন মাহফুজ আহমেদের স্ত্রী রিজওয়ানা আহমেদের চরিত্রে অভিনয় করা আরেক নামী অভিনেত্রী অপি করিম। যেটি নির্মাণ করেছেন শাফায়েত মনসুর রানা। নির্মাতা হিসেবে এটি শাফায়েতেরও প্রথম ওয়েব সিরিজ। প্রযোজনা করছে আলফা-আই। প্রচার পাচ্ছে ভারতীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হইচই থেকে। সম্প্রতি এই ‘অদৃশ্য’ থেকে দৃশ্যের আলোতে ধরা দিয়েছে এক মিনিটের জন্য। ১৪ সেপ্টেম্বর, হইচই-এর ইউটিউব চ্যানেল ও সোশ্যাল হ্যান্ডেলে। এই এক মিনিটের ট্রেইলারেই বাজিমাত মাহফুজ আহমেদের লুক। এক লুকেই ধরাশায়ী হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার দর্শক।
হইচই মনে করছে, এটি এমন এক সিরিজ যেটি দর্শকদের অজানা এক রহস্যময় অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিয়ে যাবে যে কারণে দর্শকদের শেষ পর্ব পর্যন্ত তা দেখতে বাধ্য করবে।
এ প্রসঙ্গে আনিস আহমেদ চরিত্রে অভিনয় করা মাহফুজ আহমেদকে সিরিজটি কেমন করবে সেই সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘এটার চিত্রনাট্য এক ঝলক পড়েই আমি রাজি হয়ে গিয়েছিলাম। তারপরও ওটিটিতে যেহেতু এটিই আমার প্রথম কাজ করার অভিজ্ঞতা, তাই দর্শকদের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে সেটা জানার জন্য অপেক্ষায় আছি। আমার কাছে দর্শকের মন্তব্যই সবসময় ইম্পর্টেন্টে। তখন আমরা আপনাদের কাছেই আসল কথাটি শুনব সিরিজটি সম্পর্কে দর্শক কী বলছে।’
তবে দর্শক কোন চরিত্রটি কীভাবে নিতে পারে সেটা বোঝার ক্ষেত্রে অভিনেতা মাহফুজ আহমেদ তার অভিনয়ের ক্যারিয়ারে সব সময়ই বেশ মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়ে এসেছেন। তাই তো সর্বশেষ ‘প্রহেলিকা’ সিনেমায় অভিনয় করার আগেও এমন অনেকগুলো চরিত্র আছে যেগুলোতে এই নামজাদা অভিনেতার অভিনয় এখনো দর্শকের হৃদয়ে দাগ কেটে আছে। নাটকের ক্ষেত্রে যেমন ধারাবাহিক সিরিজ ‘নুরুল হুদা’র কথাই ধরা যাক। বাংলা নাটকে যে কয়েকটি চরিত্র স্বমহিমায় উজ্জ্বল, তার মধ্যে এটি অন্যতম। অভিনেতা হিসেবে মাহফুজ আহমেদ যে অনেকদিন শীর্ষস্থানে ছিলেন তার সবচেয়ে বড় প্রভাবক ছিল এই চরিত্রটি। ২০০৪ সালে প্রথম অরণ্য আনোয়ারের পরিচালনায় বিটিভিতে প্রথম প্রচারিত হয়েছিল ‘নুরুল হুদা একদা ভালোবেসেছিল। প্রথম কিস্তির ব্যাপক জনপ্রিয়তার পর আবার নির্মিত হয় ‘অতঃপর নুরুল হুদা’। এরপর অরণ্য আনোয়ারের সঙ্গে নিজে যৌথভাবে নির্মাণ করেন দীর্ঘ ধারাবাহিক ‘আমাদের নুরুল হুদা’। এই চরিত্রে তিনি এতটাই জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন যে দর্শক জরিপে তিনি চারবার মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার পেয়েছিলেন।
মাহফুজ আহমেদকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায় আরও কয়েকটি ধারাবাহিক। তার মধ্যে ‘চৈতা পাগল’, ‘জনক’, ‘৫১ বর্তী’ ও ‘পান্থজনের সখা’।
এ ছাড়া মাহফুজ আহমেদ অনেক নাটক ও টেলিফিল্মে অভিনয় করেছেন, যেগুলোতে তার অভিনয়ের জন্য সমসাময়িক অন্যান্য জনপ্রিয় অভিনেতাদের থেকে বিশিষ্ট আসন দিতে সাহায্য করে। এগুলোর মধ্যে আছে, ‘দেবদাস’, ‘লীলাবতী’, ‘শেষপর্যন্ত তোমাকে চাই’, ‘এই বৈশাখে’, ‘লেখকের মৃত্যু’- প্রভৃতিতে তার কাজ দর্শককে এতটাই আলোড়িত করেছিল যে, দীর্ঘ আট বছর পর আবার যখন ‘প্রহেলিকা’ ছবির মাধ্যমে শোবিজে প্রত্যাবর্তন হলো মাহফুজ আহমেদের তখন তার প্রতি দর্শকের সেই পুরনো ভালোবাসাই যেন প্রেক্ষাগৃহমুখী করাতে সাহায্য করল। আর যখন ছবিতে সেই আগের মতোই স্বমহিমায় দেখা গেল মাহফুজ আহমেদকে তখন তো আর কথাই থাকে না। তখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে প্রবাসের দর্শকরাও সেই আগের মাহফুজ আহমেদকেই লুফে নিল।